অজানা ডায়েরি (ছোট গল্প)

আশিক রহমান :

আমি পুরনো জিনিসপত্র খুবই পছন্দ করি, আর পুরনো বই হলে তো কথাই নেই। তাই হাতে কিছু টাকা জমলেই এসব কিনে শোকেজ ভর্তি করে ফেলি। সেদিন আক্তার আলী একটা ডায়রি নিয়ে এলো, বেশ পুরনো না হলেও আমার ভালো লাগলো, কারণ ডায়রিটা খুব সুন্দর ছিল তা নয়, আমি কিনেছি ভেতরের লেখা পড়ে… আক্তার আলী লেখাপড়া না জানা মানুষ, জানলে হয়তো এ রকম একটি জিনিস আমার হাতে কখনোই আসতো না। কয়েকটা লাইন পড়েই ডায়রিটা নিয়ে নিলাম। ১০০ টাকা দিলাম, ও টাকাটা নিয়ে হাসিমুখে চলে গেল। মাত্র ৯ পৃষ্ঠা লেখা আর বাকি পাতায় কোন লেখা নেই। ওই লেখাটুকু ছিল…………

“শান্ত মনের মানুষগুলোর রাগ নাকি অনেক মারাত্মক হয়, গরম রক্তের হয়েও তারা শীতল রক্তের প্রাণীদের মতো ঠাণ্ডা মাথায় প্রতিশোধ নেয়। রাফসান সাহেব বলছিলেন তার নাকি প্রচণ্ড রাগ উঠেছে লোকটার উপর ইচ্ছে হচ্ছে খুন করে ফেলতে, অবশ্য তার কাছে এটা খুব একটা কঠিন কাজ না, তবে পরিস্থিতি কঠিন হবে ঘটনা ঘটানোর পর। কি করবেন তার পরিকল্পনা করে রেখেছেন অনেক আগেই! তবে এত দ্রুত যে তা করতে পারবেন তা তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি, না তিনি লোকটাকে খুন করেননি, যদিও লোকটার অপরাধের তুলনায় মৃত্যুদণ্ড স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল, কিন্তু ওপরের লেভেলে ওঁর হাত আছে বলে খালাস পেয়ে গেছে, ওঁর অপরাধ কি ছিল তা এখনো তিনি স্পষ্ট করে বলেননি, আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম উত্তরে তিনি শুধু বলেছিলেন “তুমি বুঝবে না, যার হারিয়েছে শুধু সে বুঝবে” আমি তার পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য বেশ কিছুদিন ধরেই চেষ্টা করছি। রাফসান সাহেবের টাকায় একটা স্পাইডার রোবট কিনেছিলাম ২ বছর আগে, আমার উদ্দেশ্য ছিল ওটার থিওরি নকল করে একটা লিজার্ড রোবট বানানোর, তাই সারা ফ্ল্যাট খুজে একটা টিক ধরে আনলাম। টিকটিকিটা সাইজে একটু বড়, তাই কাজ করতে সুবিধা হয়েছিল, টার্গেট ছিল বডির ভেতরটা পরিষ্কার করে মাইক্রো চিপ ঢুকিয়ে দেবো, কিন্তু হাত কাঁপছিল, একটা নিষ্পাপ প্রাণ নষ্ট করতে যাচ্ছি ভাবতেই কেমন যেন লাগছিল, আমি নিজের হাতে কোনদিন মুরগীও জবাই করিনি! আর টিকটিকিটা তো আমার কোন ক্ষতিও করেনি! একটা ছোট তেলাপোকা জার বেয়ে উপরে উঠছিল, আমি একটা কাগজ খুজছিলাম পোকাটাকে ফেলে দেয়ার জন্য হঠাৎ টিকটিকিটা দৌড়ে গিয়ে তেলাপোকাটাকে গিলে ফেলল! আমার কাছে দারুন লাগলো বিষয়টা! তাই অন্তত আজকে ওকে মারলাম না, আদর করে কিছু মশা মাছি পূর্ণ একটা স্বচ্ছ কাঁচের বক্সের মধ্যে রেখে দিলাম ঐ একটা সিদ্ধান্তই ছিল আমার অনেক বড় সাফল্য, ওঁর মাইন্ড রিড করতে মাত্র ২ মাস সময় লেগেছিল, আমি যেখানে সিগন্যাল পাঠাতাম টিকটিকিটা সেখানেই কামড় বসাতো! ওর লালাগ্রন্থিতে এমন বিষ তৈরি করে দিয়েছিলাম, যা দিয়ে একটা হাতি মেরে ফেলা সম্ভব! যদি লিকুইডটা দেহের মধ্যে প্রবেশ করে। সে যাকগে আসল কথায় আসি, একদিন ল্যাবে রাফসান সাহেব আসলেন, এই নতুন অস্র পোষা টিকটিকিটার কথা তাকে বললাম, শুনে হাসলেন, আর আমার মাথায় হাত রেখে চুল এলোমেলো করে দিতে দিতে বললেন তোমার মাথায় এসব আইডিয়া যে কোথা থেকে আসে, বুঝি না! প্রোজেক্ট দাড় করিয়ে ফেললাম, রাফসান সাহেবের আদেশে তার শত্রুর বাড়ীতে অপারেশনও শুরু করলাম, আমি ল্যাব থেকে টিকটিকিটাকে সিগন্যাল পাঠাচ্ছি, এত দূর থেকেও ভালোই ফিডব্যাক পাচ্ছিলাম। টিকটিকিটাকে দিয়ে লোকটার ডিনারের একটা তেতো আইটেমের মধ্যে চেতনা নাশক লিকুইড ড্রপ করালাম, এরপর ওটা খেয়ে শত্রু লোকটা গভীর ঘুমে লুটিয়ে পড়ল, আর সেই সুজুগে স্পাইডারটা ওঁর ব্রেইন ওয়াশ করে নিউরনের সব স্মৃতি নিয়ে ফিরে এলো, যে স্মৃতির উপর নির্ভর করে লোকটার ব্যাক্তিত্তের বিকাশ বা পারসোনালিটি তৈরি হয়েছিল। এত সব কাজ টিকটিকিটা করতে পারবে না জানতাম তাই স্পাইডার রোবটটাকে আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিলাম, শুধু লিকুইড ড্রপের কাজটা করেছিল টিকটিকি আর মুল অপারেশন করিয়েছি স্পাইডার টাকে দিয়ে। ৩ দিন পর দেখলাম অজ্ঞান লোকটাকে এম্বুল্যান্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, রাফসান সাহেব লোক পাঠিয়ে জেনেছেন ওঁর জ্ঞান ফিরেছে তবে একদম অস্বাভাবিক হয়ে গেছে কাউকে চিনতে পারছে না এমনকি কথাও বলতে পারছে না, শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে আর মুখ দিয়ে আজে বাজে শব্দ উচ্চারন করে। আমি নিশ্চিত যে এখন আপাতত দেহ জিবিত থাকলেও লোকটার মৃত্যু হয়ে গেছে! আর পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারবে না, কারণ ওঁর সব স্মৃতি যে হারিয়ে গেছে। ও যখন স্বাভাবিক হবে তখন ভিন্ন এক সত্তা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করবে, যেভাবে সদ্য জন্ম নেয়া একটা শিশু ধিরে ধিরে স্বাভাবিক সত্তায় পরিণত হয়! অথবা নতুন কেনা একটা হার্ডডিস্কে উইন্ডোজ সেটআপ করা হয়। উনি কখনোই আগের সেই বাক্তি হতে পারবেন না! কারণ তার পূর্বের কোন স্মৃতি তার কাছে নেই। রাফসান সাহেব আমার কথা শুনছেন আর হ্যাঁ সুচক মাথা নাড়ছেন। একটু পর রাফসান সাহেবের ফোনে একটা কল এলো, ওপাশ থেকে বলল… ঐ লোকটা হাসপাতালের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে মরে গেছে। রাফসান সাহেব স্বস্থির নিশ্বাস ফেলছেন, তিনি এর নাম দিলেন “অপারেশন ব্যান” রাফসান সাহেবের আর কোন শত্রু নেই, তার কাজ আপাতত শেষ তাই বাংলাদেশে থাকতে চাচ্ছেন না, এখানে থাকলে নাকি স্মৃতিগুলো তাকে প্রতিনিয়ত কাঁদাবে। কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি কানাডা চলে গেলেন। রাফসান সাহেবের মতো অদ্ভুত মানুষ আমি এখনো দেখিনি। সুতরাং “অপারেশন ব্যান” এর ঘটনাটা এখানেই শেষ হতে পারতো, কিন্তু তা হলো না! কারণ আমি এইসব তথ্য গোপন রাখতে পারিনি, আমার এক থ্রিলার টাইপ গোয়েন্দা বন্ধু ছিল, ওর কাছে আমি এরকম একটা ইন্টারেস্টিং বিষয় লুকাতে পারলাম না, সব শুনে ওঁ অবাক হয়ে গেল, ডজন খানেক শত্রুর লিস্ট আমাকে দিলো, ওঁর দিকে একটু বাঁকা চোখে তাকালাম! প্রথমে ভেবেছিলাম ও আমার সাথে মজা করছে, ও একটা চেক বই বের করল, কিন্তু কি যেন ভেবে ২টা বান্ডিল বের করে আমার হাতে দিলো! বলল, কাজগুলো করে দে আরও পাবি, আমি আর না করতে পারলাম না, ৪ দিনের মধ্যেই একে একে সবগুলোকে ব্যান করলাম। বন্ধু খুশি হয়ে এবার একটা বিশাল অঙ্কের চেক ধরিয়ে দিলো, এভাবে বেশ চলছিলো! কিন্তু আমার কীর্তি বেশিদিন গোপন থাকল না, প্রায়ই কল আসতো আমার গোপন নাম্বারে, জন প্রতি ৫০ লক্ষ থেকে কোটি পর্যন্ত অফার করত, লিস্টের মধ্যে বেশি থাকতো শহরের নামি দামী আর প্রশাসনের ব্যাক্তি বর্গ! রিকুয়েস্ট করত দ্রুত করে দেয়ার জন্য, প্রয়োজন হলে নাকি আরও দিবে! তারপরেও ওকে ব্যান করা চাই! মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করতাম আমি কি ভাড়াতে খুনি হয়ে গেলাম নাকি? আবার ভাবতাম, না! আমি তো কাউকে প্রানে মেরে ফেলছি না! আর কাজ করতে ইচ্ছে করছিল না, বিরক্তি এসে যাচ্ছিল! কর্তব্য পালনের প্রতি আমার ভীষণ রকম অনীহা! পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে অর্ডার আসে, সাধারণত তারা বেশ মোটা অংকের অফার করে, তবে দূরত্ব একটু বেশি হওয়ায় সরাসরি না করে দেই, মাঝে মাঝে নিজের নিরাপত্তার কথাও মাথায় রাখতে হয়! তবে নিরাপত্তার বিষয়টা আমার চেয়ে কাস্টমাররাই বেশি ভাবে, তারা আমাকে খুবই ভয় পায়, খুব সম্মান দিয়ে কথা বলে, বলা তো যায় না যদি আমি ই তাদের ব্যান করে দেই! ইদানিং মানসিক হাসপাতাল গুলোতে এই বিশেষ রোগীদের সংখ্যা বেড়ে গেছে, ডাক্তারেরা চিন্তিত! স্রেফ কোন দুর্ঘটনা ছাড়া একটা মানুষ কিভাবে রাতারাতি বদলে যেতে পারে, টেস্ট করে দেখা গেছে তাদের দেহে চেতনা নাশক উপাদান ছিল! কিন্তু স্মৃতি নষ্ট হওয়ার পেছনে তো শুধু এতটুকুই যথেষ্ট নয়! নতুন এই রোগ নিয়ে ডাক্তার মহলে সরগরম আলোচনা চলছে, এখনো কোন কূলকিনারা করতে পারেনি তারা। বেশ কজন রাজনৈতিক নেতা আমার শিকারে কাবু হয়েছেন বিষয়টা আমি খেয়াল করিনি, আসলে এত এত মানুষের ভীরে খোঁজ নেয়ার সময় পাই না যে কে কে আমার শিকার হলো। আজকে একটা বিশেষ দিন, সরকারী ছুটি! সময় পেয়েছি তাই লেখাগুলো আমার সিক্রেট ই-প্যাডে লিখে রাখছি, কেউ কখনোই আমার এই ঘটনাগুলো জানতে পারবে না। তবে আমি বিশ্বাস করি সত্য কোনদিন চাপা থাকে না, আমিও চাই আমার ঘটনা সকল মানুষ জানুক, কে আমি? কি আমার পরিচয়? আমি কি করেছি? সব ঘটনা সবাই জানুক। তবে অবশ্যই সেটা আমার মৃত্যুর পরে! এই কথাগুলো লিখছি “প্রিয়া” নামক একটি ডায়রিতে,, আজকের বিকেলটা খুব সুন্দর ছিল কিন্তু সেদিকে তাকানোর সময় পেলাম না, সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে, এখন উঠা দরকার… কিন্তু একি! পুরো ছাদ ভর্তি মানুষ! কারো হাতে কুড়াল, কারো হাতে চাপাতি, কারো হাতে ছুরি! প্রায় সবার হাতেই ছোট বড় অস্র! কটমট চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে! আমি ওরা এগিয়ে আসছে আর আমি পেছনের দিকে ব্যাক করছি হঠাৎ পড়ে গেলাম ছাদ থেকে! সব কিছু অনেক বেশি আলোকিত মনে হচ্ছে! অনেক লোক দৌড়ে আসছে আমাকে সাহায্য করার জন্য… এবার আলো কমতে শুরু করল… ধীরে ধীরে সব অন্ধকার হয়ে গেল।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।