ধর্ষণঃ মৃত্যুদণ্ডঃ পথের সন্ধান

দেবাহুতি চক্রবর্তী :
ধর্ষণ সহ নারীর প্রতি অব্যাহত সহিংসতার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের বাইরেও এই সহিংসতার খবর অজানা নয়।  “UN  expresses grave concern over violence against women in Bangladesh and called for Justice. “–মর্মে  খবর প্রকাশিত হয়েছে। যা সরকারের জন্য স্বস্তিকর নয়, সাধারণের কাছেও প্রত্যাশিত  নয়। দেশের অর্থনৈতিক ও নারীর  বিভিন্ন চ্যালেঞ্জিং পদে উন্নয়নের সাথে বিষয়টা যায় না। চারদিকে নানা স্বরে আজ একই আওয়াজ,  বিচার চাই, বিচার চাই।  অতিরিক্ত যন্ত্রণা আর ক্ষোভের একটা   আবেগ আছে। গণমানুষের  এই আবেগের হাত ধরেই  অনেক  পরিবর্তন  সূচিত হয়। আমাদের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের  অধিকাংশই  নিজ নিজ  সুবিধা ছাড়া কথা কম বলেন। 

সাম্প্রতিক  ঘটনায় শিল্পী সাহিত্যিকদের এক ক্ষুদ্রাংশ আবেগ আপ্লুত কিছু কথা বলেছেন।   কবি নির্মলেন্দু গুণের একটা বক্তব্য  ফেসবুকে  প্রচুর স্তুতি পেয়েছে। কী বললেন তিনি?  –” ধর্ষণের  বিরুদ্ধে  এইবার মানুষ যেভাবে সোচ্চার হয়েছে,  তেমনটি পূর্বে কখনও হয়নি। জাতি এখন ক্রসফায়ারের অপেক্ষায় আছে। মনে হচ্ছে, ধর্ষণকে “না” আর ক্রস ফায়ার কে “হ্যাঁ” বলার জন্য বাংলাদেশ এখন সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ‘—- বুঝে না বুঝে ক্রসফায়ার কথাটা  বেশ জোরালো ভাবে উঠছে এখন যা অস্বীকারের নয়।   কিন্তু, এখানে কথাটা বলছেন জাতীয় সম্মানের স্বীকৃতি পাওয়া একজন কবি। পোস্টের শেষ অংশ —” মাদকবিরোধী অভিযানে যদি শত শত ক্রসফায়ার চলতে পারে, ধর্ষণবিরোধী অভিযানে কেন নয়? অনেক সয়েছি, আর নয়। “–  মাদক বিরোধী  বা অস্ত্র উদ্ধার অভিযানের নামে যে শত শত ক্রসফায়ার  হয়, তা  গুণ প্রচার করলেন। কিন্তু, একথা ভাবলেন না যে, এই দুটো এতে বন্ধ হয়েছে কী হয় নাই?   ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ যে নামেই ডাকি বিচার বহির্ভূত এইসব হত্যাকাণ্ড কোন সমাধান এযাবৎ আনেনি। আনতে পারেও না। বরং  অনেক প্রশ্ন সামনে -পেছনে রেখে যায়। এই চলমান আন্দোলন ঘিরে আরও দাবি সোচ্চার হচ্ছে, জনসমক্ষে ফাঁসি, শিরকর্তন, পুরুষাঙ্গ কর্তন ইত্যাদি। এক বর্বরতার বিরুদ্ধে আর এক বর্বরতার সুযোগ এগিয়ে আনা।এইসব দাবি মৌলবাদকেও নানাভাবে প্রশ্রয়  দেয়। এবং অদূর ভবিষ্যতে নারীর জন্য আপাদমস্তক ঘেরটোপ জীবনে বন্দি করার প্রবণতাকেও পক্ষান্তরে স্বীকৃতি দেয়। জনগণের বড় দাবি ধর্ষণের শাস্তি  মৃত্যুদণ্ড  যা আইন হিসাবে স্বীকৃতি প্রশ্নে পরবর্তী সংসদ সভায় উঠবে বলে সরকারের  আশ্বাস পাওয়া গেছে।  সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড  সব দেশে সব মানুষের কাছে সমর্থন যোগ্য নয়। আবার অনেক দেশেই এই শাস্তির ব্যবস্থা আছে।  আমাদের আইনেও অনেক ক্ষেত্রে  মৃত্যুদণ্ডর বিধান রয়েছে। ধরে নিচ্ছি, এই আন্দোলনের ফসল হিসেবে আইন অচিরেই সংশোধিত হয়ে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড সংযোজিত হলো । তাতেই কী সব সমাধান হয়ে যাবে?  হত্যার শাস্তি ফাঁসি বলবৎ প্রথম থেকেই। তাতে কী হত্যা বন্ধ হয়েছে?  নারী শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে অনেক আইন রয়েছে, যৌতুকের বিরুদ্ধে অনেক আইন রয়েছে দেশে।  এসব আইনের ফাঁক -ফোঁকড় রয়েছে অনেক।  সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থার ফাঁক -ফোঁকড়, অলি -গলি রয়েছে আরও বেশি। এরমাঝ দিয়ে  নিরপরাধ মানুষও হয়রানির শিকার হতে পারে। আবার প্রকৃত অপরাধীরও বেরিয়ে  যাওয়ার সুযোগ অনেক। যত মামলা হয়, তার  শতকরা নব্বই ভাগ ক্ষেত্রেই  বিচার ব্যবস্থার  কারণে অপরাধী পার পেয়ে যায়। শুধু নারী -শিশু নির্যাতন, ধর্ষণের ক্ষেত্রেই নয় সমস্ত  ফৌজদারি  অপরাধের ক্ষেত্রেই একই কথা প্রযোজ্য। এই জায়গাটাও আমাদের এখন বোঝার সময় এসেছে।

সাহেদ -পাপিয়া বা   নুসরাত -রিফাত  মত  কিছু ঘটনা  বা  সম্প্রতিকালের এই ধর্ষণজনিত সংবেদনশীল কিছু ঘটনার হয়ত দ্রুতই  বিচার হচ্ছে এবং  হবে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে। ক্ষেত্রবিশেষে  পূর্বাপর  সব আমলেই  সরকারের নিজের প্রয়োজনেও  কোন কোন অভিযুক্তর বিচার  ত্বরান্বিত করতে হয়। কিন্তু  বৃহত্তর অর্থে কঠিন কঠিন আইন থাকলেই যে অপরাধী তৈরি হবে না, অপরাধ ঘটবে না বলা যাবে না। ধর্ষণ , দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণ পূর্বক হত্যা নিঃসন্দেহে বিকৃত যৌন মানসিকতাজাত বলাই যায়। কিন্তু, এর সবটাই জৈবিক না সামাজিক না রাজনৈতিক মনোজগতে তৈরি  তার জন্য বিচার -বিশ্লেষণ  ভিন্ন ভিন্ন ঘটনায় ভিন্ন ভিন্ন রকম। সম্প্রতি, প্রতিবাদকারী  অনেককেই অভিযুক্তদের মা -বাবাকে দায়ী  করছে। কোন মা -বাবাই ধর্ষক বা অপরাধীর জন্ম দেয় না। আবার কোন পরিবারই সমাজ ও রাজনৈতিক পরিবেশ নিরাবলম্ব নয়। এই ভোগবাদী সমাজ অসচেতন পরিবারগুলোয় দ্রুত প্রভাব ফেলে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বর্ণবোধের ভুবনের মাসীর মত সন্তানের মাধ্যমে এটা ওটা অর্জন ও দোষের মনে করে না। অনেক অপরাধীই কারাগার জীবনে তিলে তিলে আশ্রয় প্রশ্রয় দেওয়া পরিবার, সমাজ, আর রাষ্ট্রের অভিভাবকদের    কান কামড়ে নেবার সুযোগ পেলে নিত। আমাদের পরিবারগুলোয় সন্তানের কাছে  “মা” অধিকাংশই হুমায়ুন আযাদের কবিতার “মা” –  এর মত দাঁড়িয়ে। যাকে  পুরুষতান্ত্রিকতার নির্যাতন হতে দেখেই সন্তান বড় হয়। পরবর্তী জীবনের  অধিকাংশই তাই। পরিবার ও শিক্ষাঙ্গন  কোন রকম যৌন পাঠ তাদের দেয় না। অথচ প্রযুক্তির কল্যাণে  নানাবিধ পর্ণোগ্রাফি দেখতে দেখতেই স্বাভাবিকের বিপরীতে  বড় হয়। স্কুল জীবন থেকেই মাদক আসক্তির উপকরণ রমরমা ছড়ানো। একটু বড় হতেই নানা অবৈধ উপায়ে টাকার হাতছানি সর্বত্র। দুর্নীতির  প্রথম পাঠ হয়   শিক্ষাঙ্গনে। শিক্ষকদের সন্তুষ্টি বিধানে অভিভাবকদের অসুস্থ প্রতিযোগিতায়। খেলাধুলা বা সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ নেই বললেই চলে। এই ধর্ষণের খবরের ভীড়ে দুটো খবর অনেক চাপা পড়ে গেছে। এক কিশোরের মাকে হত্যা করে আগুনে পুড়িয়ে নির্বিকার থাকা। আর একটি হিংসাবশত ছোট বোনের গলা টিপে হত্যা।যা প্রমাণ করে  আমরা সন্তানদের জন্য কোন সুন্দর পৃথিবী  দিতে ব্যর্থ হচ্ছি। বেপরোয়া বা দুরন্ত স্বভাবের ছেলেরা অচিরেই পেশাদারি অপরাধী বা  ক্ষমতাশালীদের খপ্পরে পড়ে যায়।  পরবর্তীতে পালকদের নানা অপকর্ম ও স্বার্থ রক্ষার বিনিময়ে  কোন কিছুই  পরোয়া না  করতে এরা অভ্যস্ত হয়ে যায়। 

বিশিষ্ট মনোবিদ ডঃ নীলাঞ্জনা সান্যালের একটা আলোচনা অনেকেরই শোনা। সতেরো বছরের একটা ছেলের  আদর্শ এক দুর্বৃত্ত ব্যক্তি। যার প্রচুর অর্থ আছে। ছেলেটার বক্তব্য  তার ইঞ্জিনিয়ার  বাবা অতি সাধারণ জীবন যাপন করেন। সে যদি ওই অসামাজিক  ব্যক্তির মতই জীবন বেছে নেয়, তাহলে ছমাস জেল খাটলেও বাকি ছ’মাস  বাড়ি, গাড়ি, নারী ইচ্ছেমত পেতে পারবে। বিস্মিত হবার মতই কথা। এত প্রাচুর্য, এত ভোগবাদের সুযোগ  এই  বাংলাদেশকেও সর্বগ্রাসী দুর্নীতির প্রতিযোগিতায় নিয়ে গেছে। তার প্রতিফলন সর্বত্রই  নৈতিক  অবক্ষয়। বিচার অঙ্গণ ও তার বাইরে নয়। শুধু বিচারক বিচার করেন না। এর বিভিন্ন ধাপে সংশ্লিষ্ট পক্ষ অনেক। ডাক্তার, পুলিশ,  ডি এন এ প্রোফাইলের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা,  আইনজীবী , আদালতের কর্মকর্তা -কর্মচারী  পেরিয়ে বিচারকের হাত পর্যন্ত পৌঁছে। এর প্রতিটি ধাপই কম – বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত। আর এর সাথে এলাকার প্রভাবশালী, ক্ষমতাশালী , জনপ্রতিনিধি,  প্রশাসন  সবারই  অবৈধ হস্তক্ষেপ  লক্ষ্যণীয়।  ফলে যা আইনী ব্যবস্থা বিদ্যমান  তার সুফলও  আমরা পাই না।   নির্দিষ্ট সময়ে বিচার সম্পন্ন  না হওয়ার কারণ  বিচারকের অপর্যাপ্ততা, লোকবল,  জায়গার অভাব, তদন্তকারী কর্মকর্তার বদলি, সাক্ষী হাজির না করা বা না হওয়া, পিপির গাফলতি ইত্যাদি। জবাবদিহিতার অস্পষ্টতার কারণে   এনিয়ে মাথাব্যথা সবারই কম । ১৮৬০ সনের ধর্ষণের সংজ্ঞা, ১৮৭২ সনের সাক্ষ্য আইন আজও  চলছে। তাই, আইনের সংস্কার  জরুরি । কিন্তু আইন যথাযথভাবে প্রয়োগের  ক্ষেত্র প্রস্তুত না করা গেলে  কঠিনতম শাস্তির বিধানেও  অপরাধ  বন্ধ হবে না।  আইন  যুগসম্মত ভাবে সংস্কারের সাথে এই ব্যবস্থার সাথে যে যেখানে যতটুকু জড়িত তাদের দক্ষতা, জেণ্ডার সচেতনতা, মানবিকতা,  বাড়াতে হবে। নিরপেক্ষ ও স্বাধীন ভাবে কাজ করার পরিবেশ থাকতে হবে। বিচারক আর সরকারি আইনজীবী নিয়োগ দলীয় পুরষ্কার হিসেবে না দিয়ে যোগ্য হিসাবে বাছাই করতে হবে। কিছুদিন আগে হাইকোর্ট ডিভিশনের দ্বৈত বেঞ্চে বিচারপতি মোঃআশরাফুল কামাল ও রাজিব আল জলিল  –সরকার বনাম চেয়ারম্যান  ১ম কোর্ট অব সেটলমেন্ট মামলার রায়ে দুর্নীতিমুক্ত বিচার বিভাগ আইনের শাসনের অন্যতম শর্ত কথার পর জোর দেন। যতদিন  যাচ্ছে, ততই মনে হচ্ছে এই সমাজের যা কিছু অবক্ষয় তার সাথে প্রথম ও প্রধানভাবে জড়িয়ে আছে দুর্নীতি । এর সাথে জড়িত মাদক,নারীশিশু পাচার, অস্ত্র ও  সন্ত্রাস সহ  সকল সামাজিক দুরাচার  আর  পুরুষতান্ত্রিক  ক্ষমতার আস্ফালন। 

এইসব অপরাধের সাথে  আপোষ বা সালিশে মীমাংসায় যারা বাধ্য করে তাদেরও বিচারের অধীনে আনতে হবে। আবার  এও মনে রাখতে হবে Justice delayed, Justice denied যেমন সত্য, তেমন এটাও সত্য যে Justice hurried, Justice buried.  একরাতের মাঝে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড  চলতে পারে। কিন্তু বিচার নয়। সরকারের মন্ত্রীদের কথাবার্তার লাগাম থাকতেই হবে। অভিযুক্তদের অধিকাংশর নাম যেহেতু সরকারি দলের  সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে এই দায় সরকার এড়াতে পারে না।   অপরাধ সংঘটনের পরে দল থেকে বহিষ্কার  করা না করা এখন প্রায় সমার্থক হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন ধাপে দলীয় অপরাধীদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আশ্রয় প্রদান,   দলীয় বিচারে ক্যাপিটাল  শাস্তিপ্রাপ্তদের রাষ্ট্রপতির ক্ষমা দিয়ে দেশের বাইরে পুনর্বাসনের নজির ও বন্ধ করতে হবে। ক্ষমার ক্ষেত্রে  মানবিক বিষয়টা অবশ্যই আলাদা। রাষ্ট্র  বা সরকারের চরিত্র রাতারাতি পরিবর্তন হবে না। পূর্বাপর  সব সরকারের আমলের খতিয়ানই   দেশের ইতিহাসে রেকর্ডভুক্ত। রাষ্ট্রের  মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের সংগ্রাম আলাদা। এখন  অপেক্ষাকৃত ভাবে আইনের শাসন  ইতিবাচক ভূমিকায় কীভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, তাই আপাত সন্ধান দরকার। তারজন্য সরকারকে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ  নিয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন।  তবে শুধু সরকারের ওপর ভরসা নয়,  দেশের সর্বত্র গঠনমূলক সামাজিক আন্দোলন  প্রয়োজন। যা অনেক অপরাধ প্রতিরোধের দায়িত্ব   ভালোভাবে  পালন করতে পারে। ইদানীং  অনেকেই অতি আবেগের প্রতিক্রিয়ায় ” ধর্ষণ সংস্কৃতি ” — হিসেবে ক্ষোভ প্রকাশ করে।সবিনয়ে অনুরোধ, সংস্কৃতি “–শব্দটার আমরা অপব্যবহার না করি। ধর্ষণ বা যে কোন অনাচার সংস্কৃতিভ্রষ্ট  গোষ্ঠীর  হাতেই লালিত -পালিত হয়। সংস্কৃতি “–শব্দের অর্থ  নিয়ত শুদ্ধিকরণের অনুশীলনের মাঝ দিয়ে উৎকর্ষতায় পৌঁছানো।  আসুন, আমরা সর্বস্তরে   সংস্কৃতি “–শব্দটাকে ধারণের চেষ্টা করি। যে সংস্কৃতি পুরুষতান্ত্রিক সমাজ লালিত সকল অনাচারের বিরুদ্ধে মানবিকতা বোধে উত্তীর্ণ  হতে সহায়ক ভূমিকা  পালন করবে।

লেখক : আবোল-তাবোল শিশু সংগঠনের সভাপতি।
debahuti1952@gmail.com

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।