ভ্যাকসিন কি ফিরিয়ে আনবে জীবনের ছন্দ!

সুমিত্র মিত্র : আমাদের দেশের করোনা-ক্লান্ত, বিষাদগ্রস্ত ও তালাবন্ধ চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই যে, পৃথিবীর সম্পন্ন দেশগুলিতে এই মহামারী রোখার জন্য ভ্যাকসিন এই এসে গেল বলে এবং সেখানে বর্ষশেষে বাজবে যে-বিদায়ঘণ্টা, তা শুধু বিগত বছরের জন্যই নয়, এই নিষ্ঠুর ভাইরাসের উদ্দেশেও। তবে ভারতে মানবদেহে টিকা প্রয়োগের জন্য সময় লাগবে আরও বেশি। কারণ, যে টিকা আমেরিকা, পশ্চিম ইউরোপ বা জাপানে ব্যবহৃত হতে চলেছে, তা প্রথমত অনেক ব্যয়সাপেক্ষ, তা ছাড়া সেটি প্রস্তুত করতে ধনী দেশ থেকে এত বেশি পরিমাণে অর্থ আগাম দেওয়া হয়েছে যে, তাদর দাবিই হবে অগ্রগণ্য। সুতরাং ভারতকে করোনা-উত্তর সুপবনের জন্য অপেক্ষা করতেই হবে।
তবে করোনা বিদায় নিতে আর বেশি দেরি নেই, এটা জানার সঙ্গে সঙ্গে উচ্ছ্বাস অনুভব করা গেল শুধুমাত্র একটি খবর। এয়ারবিএনবি-নামটি ভ্রমণবিলাসীদের কাছে বহুল পরিচিত। তাদের তালিকায় আছে পৃথিবীর দুশো কুড়িটি দেশের প্রায় এক লক্ষ শহরে, ছাপ্পান্ন লক্ষ বাড়িওয়ালার সম্পত্তির বিবরণ। ম্যানচেস্টার থেকে মানালি, প্যারিস থেকে পটনা, কোথায় নেই এয়ারবিএনবি-র আশ্রয়? ইচ্ছে হলেই ওই প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে আপনি ঘর বুক করতে পারেন কার্য দিয়ে পাওনা চুকিয়ে। সেখানে গৃহকর্তা দেখেছি ‘কর্ত্রী’-ই বেশি) অপেক্ষারত। তবে পুরো ২০২০ বছরটা এই কোম্পানির কাছে এক বিভীষিকা হয়ে আছে। বুকিং একদম নেই। ভাইরাসের ভয়ে কেউ উঠবে না অচেনা শহরে অপরিচিত ব্যক্তির গৃহে। ব্যবসাটি সম্পূর্ণ টেকনোলজি নির্ভর, অর্থাৎ হোটেল ব্যবসায়ের মতো শয়ে শয়ে কর্মীর ভিড় নেই। রোজগারের অভাবে তবু দু’হাতে কর্মী ছাঁটাই হয়েছে। কিন্তু ভ্যাকসিনের বার্তা হাজির হতে না-হতেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল এতগুলো মাসের অবসাদ ও গ্লানি। ধার করে দায়ের বোঝা না-বাড়িয়ে এয়ারবিএনবি নতুন শেয়ার ছাড়ছে বাজারে, যা কোম্পানির মূল্য এক ধাক্কায় নিয়ে যাবে ৩০ বিলিয়ন ডলারে। তার না-আছে বড় বড় শহরে বিলাসবহুল হোটেল না লাভজনক রেস্তরা। কিন্তু একবছর ঘরবন্দি থাকার পর মানুষের নির্ভয়ে ছুটি কাটানোর কী ব্যাপক উন্মাদনা, তা বোঝা যাচ্ছে এই ইন্টারনেট-সম্বল ঘরভাড়া সন্ধানী ব্যবসায়ের শেয়ারের জন্য এখন থেকেই আবেদনকারীর ঔৎসুক্য দেখে।
আমাদের দেশটি গরিব। এবং চাকরিও হারিয়েছেন অনেকেই। তবে দীর্ঘকাল ঘরে বন্ধ থাকার পর এদেশেও মানুষ যে পড়ি-কি-মরি বাইরে বেরবে, আবার একবার সবুজ প্রকৃতি বা নীল সমুদ্রকে দু’চোখ ভরে দেখতে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তবে একটা কথা, কোভিড-উত্তর ভ্রমণ হয়তো খুব শীঘ্রই আর আগের মতো হবে না। হয়তো তা কোনদিনও হবে না। এই ভাইরাস অপসৃত হলেও তার অভিজ্ঞতা একটি বড় শিক্ষা রেখে যাচ্ছে মানবজাতির জন্য। তা হল, মানুষ সামাজিক জীব হলেও নিরাপদ জীবনের জন্য তাকে সামাজিক দুরত্বও রক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে এই করোনাভাইরাস গোষ্ঠীর প্যাথোজেনের সংক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য। শহর আবর্জনামুক্ত হলে পরিত্রাণ সম্ভব প্লেগের কবল থেকে। পানীয় জল পরিষ্কার হলে কলেরার আশঙ্কা দূর হয়। কিন্তু করোনা-জাতীয় ভাইরাস সংবাহিত হয় মানুষে-মানুষে সান্নিধ্যে। তার নিয়ন্ত্রণ সোজা কথা নয়!
কয়েক সপ্তাহ আগে আমার পরিচিত এক দম্পতি গিয়েছিলেন হিমাচল প্রদেশের সোলান জেলার ছোট্ট পর্বত-শহর কসউলি-তে। শুনলাম, যে-হোটেলে ঘর বুক করা ছিল, সেখানে রিসেপশনে কোনও মানুষ নেই (এটি অবশ্য ইউরোপের অনেক ছোট হোটেলেই অনেক কাল ধরে প্রচলিত), শুধু ডেস্কে পড়ে রয়েছে তাদের নির্দিষ্ট কক্ষটি খোলার জন্য কার্ড। তাঁরা দু’রাত্রি হোটেলে ছিলেন, কিন্তু দেখা হয়নি একজনও সহ-আবাসিকের সঙ্গে। কারণ, লবিটি তো নির্বান্ধব এবং ডাইনিং হলে অতিথিদের পর্যায়ক্রমে ডাকা হয়, যাতে কখনওই ওই ঔপনিবেশিক আমলের প্রাসাদের হলঘরে দু’-তিনটির বেশি টেবিলে ভোজনকারীরা না-বসেন। তা ছাড়া হোটেলের জিম, সুইমিং পুল, সামাজিক ও ব্যবসায়িক অনুষ্ঠান ইত্যাদি-যা তার উপার্জনের এক গুরুত্বপূর্ণ সূত্র, তা এখন বন্ধ এবং মনে হয় না অদূর ভবিষ্যতে গ্রুপ ট্যুরে আগত অতিথিরা পুলে ঝাঁপিয়ে পাশাপাশি সাঁতার কাটতে পারবেন। বোঝাই যাচ্ছে, সামাজিক দূরত্ববিধির ধাক্কায় হোটেল বলতে যা এতদিন জানতাম, তাতে ব্যাপক পরিবর্তন আসন্ন। হয়তো সেটি আন্দাজ করেই বিদেশি শেয়ার বাজারে আগ্রহ জন্মেছে এয়ারবিএনবি-র মতো ভাড়াবাড়ির প্রতিবেশী-বর্জিত নিরাপত্তায়।
পরিবর্তন হবে যাত্রার পদ্ধতিতেও। ট্রেনভ্রমণ চালু হলেও মনে হয় না অ-সংরক্ষিত শ্রেণি আবার ফিরে আসবে। সন্দেহ আছে থ্রি-টিয়ের কোচের ভবিষ্যৎ নিয়েও। বিমানে আসনসংখ্যা কমলে ভাড়া রকেটগতিতে ঊর্ধ্বগামী হবেই। গণপরিবহণে যাত্রা সম্পর্কে আশঙ্কা থেকেই যাবে। অর্থনীতিতে একটা গতি এলেই মানুষ চাইবে ট্রেন নয়, বাস নয়-ব্যক্তিগত বাহন। আর, তা হল ছোট ছিমছাম একটি ফোর হুইলার।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।