শুভ জন্মদিন বাংলাদেশ কৃষক লীগ

সরদার মাহামুদ হাসান রুবেল:

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অন্যতম সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ কৃষক লীগের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠা, ন্যায্য দাবি ও সম্মান আদায়ের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের ১৯ এপ্রিল সংগঠনটি গঠন করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

তিনি কৃষকের পাশে কীভাবে দাঁড়িয়েছিলেন, সেটা লিখে গেছেন ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও আমরা পাই এর বিশদ বিবরণ। ১৯৪৯ সালের ২৯ জানুয়ারি খুলনা থেকে পাঠানো এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘২৮ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে খুলনা মিউনিসিপ্যাল পার্কে ঢাকা, ফরিদপুর ও কুমিল্লার প্রায় ৩৫০ জন কৃষকের সমাবেশে যোগ দেন। তিনি তাদের নিয়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের বাঙলোয় যান এবং ধানকাটার মজুরি বাবদ পাওয়া ধান নিয়ে নিজ নিজ বাড়িতে যাওয়ার পারমিট দাবি করেন।’ [গোয়েন্দা প্রতিবেদন, প্রথম খণ্ড পৃষ্ঠা ৮৯]

১৯৫২ সালের ১৬ আগস্ট বঙ্গবন্ধু রংপুর শহরের জনসভায় ভাষণ দেন। তিনি পাটের মণ সরকার নির্ধারিত ১৬ টাকার পরিবর্তে ৩০ টাকা করার দাবি জানান। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, সভার প্রথম তিনটি প্রস্তাব ছিল পাটসংক্রান্ত। একটি প্রস্তাবে পাটের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত পাটচাষীদের দেওয়া ঋণ আদায় স্থগিত রাখার দাবি জানানো হয়। পরের দিন দিনাজপুরের সমাবেশেও তাঁর ভাষণের মূল ইস্যু পাট। ১৮, ১৯ ও ২০ আগস্ট তিনি বগুড়া, রাজশাহী ও পাবনায় জনসভা ও কর্মী সমাবেশে বক্তৃতা করেন। গোয়েন্দা প্রতিবেদন সূত্রে আমরা জানতে পারি, তিনি ৩০ আগস্ট বরিশাল এবং ৭ থেকে ১১ সেপ্টেম্বর খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া ও পাবনায় সফর করেন। প্রতিটি সমাবেশেই পাটশিল্প জাতীয়করণের দাবি তোলা হয়। লালদিঘী ময়দানের সমাবেশে পাকিস্তান সরকারের পাটনীতির সমালোচনা করেন।

তিনি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমিত থাকেননি- কৃষকদের দাবি সামনে এনেছেন। আর এটা করার জন্য তিনি চলে গিয়েছিলেন জেলা-মহকুমা-থানা এমনকি গ্রাম পর্যায়ে, যেখানে কৃষকদের বসবাস ও কাজের ক্ষেত্র।

বাংলার কৃষি ও কৃষকের সম্মান বৃদ্ধিতে লড়াই করে গেছেন নিজ প্রশাসনের বিরুদ্ধেও। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ জাতির উদ্দেশে ভাষণে সরকারি কর্মচারীদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন,

‘সরকারি কর্মচারীদের বলি, মনে রেখো, এটা স্বাধীন দেশ। এটা ব্রিটিশের কলোনি নয়। পাকিস্তানের কলোনি নয়। যে লোককে দেখবে, তার চেহারাটা তোমার বাবার মতো, তোমার ভাইয়ের মতো। ওদের পরিশ্রমের পয়সায় তুমি মাইনে পাও। ওরাই সম্মান বেশি পাবে। কারণ, ওরা নিজেরা কামাই করে খায়।’

‘আপনি চাকরি করেন, আপনার মাইনে দেয় ঐ গরিব কৃষক। আপনার মাইনে দেয় ঐ গরিব শ্রমিক। আপনার সংসার চলে ওই টাকায়। আমরা গাড়ি চড়ি ঐ টাকায়। ওদের সম্মান করে কথা বলুন, ইজ্জত করে কথা বলুন। ওরাই মালিক। ওদের দ্বারাই আপনার সংসার চলে।’

শুধু মাঠে ময়দানে নয় ১৯৭৫ সালের ১৫ জানুয়ারী সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাসের পর এক আবেগঘন বক্তৃতায় সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতীয় সংসদে দেওয়া সর্বশেষ ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, আজকে করপশন (দুর্নীতি)-এর কথা হয়। আজকে বাংলার মাটি থেকে করপশন উৎখাত করতে হবে। করপশন বাংলার কৃষক করে না। করপশন বাংলার মজদুর করে না। করপশন করি আমরা শিক্ষিত সমাজ-যারা আজকে এদের টাকা দিয়ে লেখাপড়া করেছি।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে কৃষক লীগের প্রতিটি নেতাকর্মীকে জানাতে চাই কৃষককে শুধু ভালোই বাসতেন না সম্মানও করতেন বঙ্গবন্ধু। কৃষকের অধিকার ন্যায্য হিস্যা প্রতিষ্ঠা করতে নিজ হাতে গড়েছেন বাংলাদেশ কৃষক লীগ। মনেরাখবেন দেশ, মাটি, মানুষ আর গ্রামকে সুন্দর ও সঠিকভাবে ধরে রাখতে হলে অবশ্যই কৃষি ও কৃষকদের অধিকার মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। সমাজের অন্য শ্রেণি-পেশার মানুষের মতো তাদের সম্মান দিতে হবে। কৃষিকে উৎসাহিত ও উৎপাদন বৃদ্ধি এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হলে কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। তাই বুঝতেই পারছেন আপনাদের দায়িত্বের কত ব্যাপ্তি?

কৃষক লীগের নেতাকর্মীকে খেয়াল রাখতে হবে শুধু কৃষিতে ভর্তুকি, সার, বীজ সরবরাহ করলেই হবে না, একই সঙ্গে কৃষিপণ্যের উপযুক্ত মূল্য যেন কৃষক পায় তার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কৃষক কৃষিকাজ করে যে খাদ্যশস্য উৎপাদন করে তা থেকে যদি সে লাভবান হয় তাহলেই কৃষি উৎপাদন বাড়বে। তাই দেশে যথাযথ খাদ্যের সংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কৃষক ও কৃষিকে বাঁচাতে হবে। আর তাদের বাঁচাতে হলে কৃষিতে ভর্তুকি যেমন বাড়াতে হবে এবং এ ভর্তুকি যাতে প্রকৃত কৃষক পায় তা নিশ্চিত করতে হবে।

আজ কৃষক লীগের শুভ জন্মদিনে সারা দেশের কৃষক লীগের সাবেক ও বর্তমান নেতৃবৃন্দকে জানাই শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

লেখকঃ কৃষি ও সমবায় উপ-কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা মহানগর বঙ্গবন্ধু পরিষদ।

সুত্র: (সংগৃহীত)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।