স্মৃতিতে একাত্তরের ১৭ এপ্রিল

মো. জয়নাল আবেদীন খান :

একাত্তরের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বলতম অধ্যায়। মুিজবনগরের পথ ধরেই বাঙালির স্বাধীনতার অরুণোদয় হয়েছে। আমাদের মুক্তিসংগ্রাম যদি কোনো মহাকাব্য হয়, তাহলে মুজিবনগর সেই মহাকাব্যের প্রথম পাতা।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তের ছোট্ট একটি জেলা মেহেরপুর।এ জেলার রয়েছে প্রায় দুই হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ঘটনায় মেহেরপুরের মুজিবনগরের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। ইতিহাসের বাঁক বদলের ধারায় গোটা বাঙালি জাতির একটি সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিচয়কে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে একাত্তরের মুজিবনগর।
বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে ১৭ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস শ্রেষ্ঠতম অর্জন এবং স্মরণীয় দিন। আজ পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। স্মরণ করি জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে, যাঁদের নেতৃত্বে সেদিন মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়েছিল। ১৭ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবসের সঙ্গে তাঁদের নাম মিশে আছে। আজ স্মৃতিতে অনেক কথাই ভেসে উঠছে। ১৬ এপ্রিল ১৯৭১ সাল রোজ শুক্রবার। তত্কালীন বাগোয়ান সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমি, ভবেরপাড়া সংগ্রাম কমিটির সভাপতি আবদুল মোমিন চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব হোসেন মণ্ডল বাইসাইকেলে চড়ে বিকেলবেলা মেহেরপুর মহকুমা আওয়ামী লীগের তত্কালীন সভাপতি এম এন এ সহিউদ্দিন//// সাহেবের বাসভবনে যাই। বাসার বাইরে আরো কয়েকজন নেতাকর্মীর সঙ্গে দেখা। আমাদের কয়েকজনকে বাসার ভেতর ডেকে নিয়ে যাওয়া হলো। আমাদের বলা হলো, আগামীকাল ১৭ এপ্রিল সকাল ৯টায় বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ নেবে, তোমাদের একটি মঞ্চ তৈরি করে উপরিভাগে একটি টেবিল ও সামনে কয়েকটি চেয়ার রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে তৎক্ষণাৎ বৈদ্যনাথতলাসংলগ্ন ভবেরপাড়া গ্রামে চলে যাই। সুশীল মণ্ডল, পিন্টু বিশ্বাস, রফিক মাস্টার, সৈয়দ মাস্টারসহ বেশ কয়েকজন প্রায় সারারাত ধরে স্থানীয় মিশন ও আশপাশের মানুষের বাড়ি থেকে চারটি চৌকি, একটি টেবিল এবং ৩৪টি কাঠের চেয়ার সংগ্রহ করে মঞ্চ তৈরিসহ সব প্রস্তুতি নিয়ে রাখলাম। দু-একটি চেয়ারের আবার হাতলও ভাঙা ছিল। সেই সময়ে ভবেরপাড়া মিশনের ফাদার ফ্রান্সিস ও সিস্টার ক্যাথারিনার সহযোগিতার কথা কখনো ভুলব না। ১৭ এপ্রিল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। দিনটি ছিল শনিবার। ঠিক সকাল ৯টা ১৫ মিনিটের দিকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অনেক গাড়ি এসে বৈদ্যনাথতলা আমবাগনটিকে ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলে ও গাড়ি থেকে কয়েক ড্রাম মিষ্টি আমবাগানের একটি স্থানে নামিয়ে রাখে, যা শপথ গ্রহণ শেষে উপস্থিত জনসাধারণের মাঝে বিতরণ করা হয়। বিএসএফের কিছু গাড়িতে করে জাতীয় নেতাদের বসার জন্য কিছুসংখ্যক চেয়ার আনা হয়। এর পরপরই ৯টা ৩০ মিনিটের দিকে দেশি-বিদেশি অনেক সাংবাদিকসহ জাতীয় নেতারা সভাস্থলে এসেই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শুরুর ব্যবস্থা নিলেন। প্রথমে আমাদের কয়েকজনের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মুজিবনগর আম্রকাননে অধ্যাপক ইউসুফ আলী আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র (প্রোক্লেমেশন অব ইনডিপেনডেন্স) পাঠ করেন এবং সাংবিধানিক পরিষদের চিফ হুইপ হিসেবে বাংলাদেশের সার্বভৌম সর্বোচ্চ সংস্থারূপে নবগঠিত সরকারের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরের সেই বিশাল সমাবেশে জনতার উদ্দেশে তাঁর ভাষণে বলেন, আজ এই মুজিবনগরে একটি স্বাধীন জাতি জন্ম নিল। বিগত ২৪ বছর ধরে বাংলার মানুষ তার নিজস্ব সংস্কৃতি, নিজস্ব ঐতিহ্য, নিজস্ব নেতাদের নিয়ে এগোতে চেয়েছেন। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি কায়েমি স্বার্থবাদীরা তা হতে দেয়নি। তারা আমাদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। আমরা নিয়মতান্ত্রিক পথে এগোতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তাতেও তারা বাধার সৃষ্টি করে আমাদের ওপর চালানো হয় বর্বর আক্রমণ, তাই আমরা আজ মরণপণ যুদ্ধে নেমেছি। এ যুদ্ধে জয় আমাদের অনিবার্য। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ মুজিবনগরের শপথ অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আজ হোক আর কাল হোক বাংলাদেশে একদিন স্বাধীন হবেই। আমরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে বিতাড়ন করবই। আজ না জিতি কাল জিতব। কাল না জিতি পরশু জিতবই। ’ বাংলাদেশে ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যার ঘটনা দেখেও বিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্রগুলো আজ যে নীরবতা অবলম্বন করছে তার জন্য আমি গভীরভাবে দুঃখিত। আমি প্রশ্ন করতে চাই, লাখ লাখ নিরীহ নিরস্ত্র মানুষকে বিনা কারণে হত্যা করাকে ইসলাম অনুমোদন করে কি? মসজিদ, মন্দির বা গির্জা ধ্বংস করার কোনো বিধান কি ইসলামে আছে? বাংলাদেশের মাটিতে আর কোনো সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তাদের মাতৃভূমিকে মুক্ত করতে যুদ্ধ করছে। নিরীহ, নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির মুক্তিসংগ্রামকে স্তব্ধ করা যাবে না। পৃথিবীর মানচিত্রে আজ যে নতুন রাষ্ট্রের সংযোজন হলো তা চিরদিন থাকবে। এমন কোনো শক্তি নেই যে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অস্তিত্বকে বিশ্বের মানচিত্র থেকে মুছে ফেলতে পারে। শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ ৭১-এর মার্চ মাসের ৩০ তারিখে কুষ্টিয়ার তত্কালীন গণপরিষদ সদস্য ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে চুয়াডাঙ্গা, দামুড়হুদা হয়ে ওপারে চেংড়াখালী বিএসএফ ক্যাম্পে যান। ক্যাম্প কর্তৃপক্ষ তাঁদের গার্ড অব অনার প্রদান করে। ওই দিনই কলকাতায় গিয়ে ১ এপ্রিল তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম এমএনএ ভারতের রাজধানী দিল্লি পৌঁছে যান। ৪ এপ্রিল ও ৬ এপ্রিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সরকারের সঙ্গে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন ও মুক্তিযুদ্ধে সার্বিক সহায়তা প্রদানের ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা শেষে একটি ঐকমত্য সৃষ্টি হয়। ৮ এপ্রিল কলকাতায় ফিরে একটি গেস্ট হাউসে উপস্থিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যসহ যুব ও ছাত্রনেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ৯ এপ্রিল ছয় সিটের একটি ছোট্ট প্লেনে তাজউদ্দীন আহমদ, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামসহ আরো কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা শিলিগুড়ি পৌঁছান। তোরা পাহাড়ের নিচে এক গেস্ট হাউস থেকে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও টাঙ্গাইলের আব্দুল মান্নানকে নিয়ে ১০ এপ্রিল আগরতলায় উপস্থিত হন। ওই দিনই রাতে আওয়ামী লীগের সংসদীয় পার্টির সভা করে সরকার গঠন করাসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত হুইপ ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম এমএনএ রচিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ‘মুজিবনগর সনদ’ অনুমোদন দেওয়া হয়। তত্কালীন কুষ্টিয়া জেলার জাতীয় পরিষদ সদস্য ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান আক্কাস, সহিউদ্দীন বিশ্বাস, ব্যারিস্টার আবু আহম্মেদ, আফজালুর রশিদ (বাদল রশিদ) প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য গোলাম কিবরিয়া, অ্যাডভোকেট আহসান উল্লাহ, ডা. আসহাবলু হক (হেবা) অ্যাডভোকেট ইউনুস আলী, মো. নুরুল হকসহ মেহেরপুর মহকুমা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. ইসমাইল হোসেন, সহসভাপতি আ কা ম ইদ্রিস আলী, সহসভাপতি ডা. আবু আব্দুল্লাহ, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. জালাল উদ্দীন, কোষাধ্যক্ষ ডা. আব্দুর রশিদ, সাহাবাজ উদ্দীন লিজ্জু, এ কে আসকারী (পটল) খাদেমুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম (পটল মিয়া), ইসমাইল হোসেন মণ্ডল (মানিক মিয়া), মুজিবনগর এলাকায় দারিয়াপুরের ডা. আলহাজ শামছদু//// হুদা, ওয়াজেদ আলী, বাকের আলী, কলিম উদ্দিন, এ বি এম আসাদুল হক, আলীজান মাস্টার, ইউনূস আলীজান মাস্টার, মোকাম আলী, মোজাম্মেল হক মাস্টার, সোনাপুরের অ্যাডভোকেট রুস্তম আলী, অ্যাডভোকেট আবু তৈয়ব, আকরব/ আলী মাস্টার, নাজিরাকোনা গ্রামের জামাত আলী মোল্লা, বাগোয়ানের সংগ্রাম কমিটির সভাপতি নুরুল ইসলাম, শাহাবুদ্দীন (সেন্টু), মতিয়ার রহমান, আনন্দবাস গ্রামের রফিক উদ্দিন, মানিকনগরের দোয়াজ আলী মাস্টার তাঁদের সার্বিক সহযোগিতায় মেহেরপুর মহকুমার এসডিও তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ঝিনাইদহের এসডিপিও মাহাবুব উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে ভবেরপাড়া গ্রামের ১২ জন আনসার সদস্য মুজিবনগর সরকারের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন।সেদিন আমরা কয়েকজন ছাত্র গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকারের মহামান্য উপরাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীদের গাড়িতে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা বেঁধে দিয়েছিলাম। ঐতিহাসিক এই দিনে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি ভারতের প্রয়াত মহীয়সী প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী ও ভারতীয় বীর জনতাকে, যাঁরা মুজিবনগর সরকারকে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করে এবং প্রায় এক কোটি শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। আমি তত্কালীন ভারতীয় সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আজ আমাদের একটাই দাবি—মুজিবনগরকে বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হোক। তাকে তার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে বছরে অন্তত একটি ক্যাবিনেট মিটিং মুজিবনগরে করার ব্যবস্থা নেওয়া হলে বাংলাদেশের মানুষ খুশি হবে। মুজিবনগর স্থলবন্দর, মুজিবনগর ইপিজেড/বাণিজ্যিক জোন, মুজিবনগর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, মুজিবনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে এই এলাকায় মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি, যা আজও পূরণ হয়নি। প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ এখন সময়ের দাবি।

 

লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক সংসদ সদস্য, সাবেক সভাপতি জেলা আওয়ামী লীগ, মেহেরপুর।   

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।