৭ মার্চ: সকল নিপীড়িত মানুষের মুক্তির প্রেরণা

 সরদার মাহামুদ হাসান রুবেল :

৭ মার্চ ‘জাতীয় ঐতিহাসিক দিবস’ শুধু বাঙালীর নয় বিশ্বের সকল নিপীড়িত মানুষের মুক্তির অনুপ্রেরণা। আজ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ইউনেস্কোর মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্ট্রারে অন্তর্ভুক্ত। কি অদ্ভুত ব্যাপার তাইনা? যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু ঘোষনা করেছিলেন “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম- এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পরাজিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সেই উদ্যানেই আত্মসমর্পণের দলিলে সই করেছিলো।

বিশ্বে আড়াই হাজার বছরে মাত্র ৭৭টি ঐতিহাসিক নথি ও প্রামাণ্য দলিলের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে ‘ডকুমেন্টারি হেরিটেজ’ হিসেবে ‘মেমোরি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে’ যুক্ত করেছে ইউনেস্কো।

কি অসাধারণ ১৮ মিনিটের শব্দ গুচ্ছ? স্বাধীনতার জন্য সকল নির্দেশনা দিয়েছেন। হুকুমের অপেক্ষায় বসে না থাকতে বলেছেন, ‘তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তা-ই দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু–আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে।’ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু ভাষণটি দিয়েছিলেন। একদিকে তিনি পরিষ্কার স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, অন্যদিকে তাকে যেন বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে অভিহিত করা না হয়, সেদিকেও তাঁর সতর্ক দৃষ্টি ছিল। কারন সেদিনও পাকি সেনাবাহিনীর ছিলো যুদ্ধ-প্রস্তুতি। শাহবাগ হোটলের (বর্তমানে বিএসএমএমইউ) ছাদ সহ প্রতিটি স্থাপনায় ছিলো মেশিনগান প্রস্তুত করা। যেখানেই জনগণের জমায়েত, সেখানেই মেশিনগান। জনসভাকে কেন্দ্র করে কামান বসানো হয়। এমনকি আকাশে উড়ছিলো যুদ্ধ বিমান।

ওই মুহূর্তে আনুষ্ঠানিক অর্থে স্বাধীনতা ঘোষণা করলে লক্ষ লক্ষ মানুষের গুলি খাওয়া ছাড়া আর কোন পথ ছিলো না। তাঁর এই সতর্ক কৌশলের কারণেই ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে পাকি সেনাবাহিনী এই জনসভার ওপর হামলা করার প্রস্তুতি নিলেও তা করতে পারেনি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও শেখ মুজিবকে ‘চতুর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, শেখ মুজিব কৌশলে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে চলে গেলো, কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারলাম না’ (ডয়েচে ভেলে, ৩১ অক্টোবর, ২০১৭)।
পাকি মেজর সিদ্দিক সালিক তার গ্রন্থে লিখেছেন, পূর্ব পাকিস্তানের জিওসি ৭ মার্চের জনসভার প্রাক্কালে আওয়ামী লীগ নেতাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘পাকিস্তানের সংহতির বিরুদ্ধে কোনও কথা বলা হলে তা শক্তভাবে মোকাবেলা করা হবে। বিশ্বাসঘাতকদের (বাঙালি) হত্যার জন্য ট্যাংক, কামান, মেশিনগান সবই প্রস্তুত রাখা হবে। প্রয়োজন হলে ঢাকাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হবে। শাসন করার জন্য কেউ থাকবে না কিংবা শাসিত হওয়ার জন্যও কিছু থাকবে না।’

৭ মার্চের ভাষণের মূল কয়েকটি দিক হচ্ছে- সামগ্রিক পরিস্থিতির ও বাঙালীর বঞ্চনার ইতিহাস পর্যালোচনা; বঙ্গবন্ধুর নিজ ভূমিকা ও অবস্থান ব্যাখ্যা; পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিকদের ভূমিকার ওপর আলোকপাত; সামরিক আইন প্রত্যাহারের আহ্বান; অত্যাচার ও সামরিক আগ্রাসন মোকাবেলার হুমকি; দাবি আদায় না-হওয়া পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে সার্বিক হরতাল চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা এবং নিগ্রহ ও আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য স্বাধীনতার আহবান। এই ভাষণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু জাতির সামনে কেবল একটি স্বাধীন রাষ্ট্রই উপস্থাপন করেননি, বরং এর ভবিষ্যৎ কী হবে তা-ও তুলে ধরেন।

কিউবার অবিসংবাদিত নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেছেন, ৭ মার্চের শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শুধুমাত্র ভাষণ নয়, এটি একটি অনন্য রণকৌশলের দলিল। যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হীথ বলেছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে যতদিন পরাধীনতা থেকে মুক্তির জন্য সংগ্রাম থাকবে, ততদিন শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণটি মুক্তিকামী মানুষের মনে চিরজাগরুক থাকবে। এ ভাষণ শুধু বাংলাদেশের মানুষের জন্য নয়, সারাবিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণা। নিউজউইক ম্যাগাজিন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘রাজনীতির কবি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

যুগের পর যুগ চলে গেছে কিন্তু এ ভাষণ এখনো মানুষের মধ্যে প্রেরণা যোগাচ্ছে। পৃথিবীর অন্য কোনো নেতার ভাষণ মানুষের ওপর এতোটা আবেদন রাখতে পেরেছে কিনা আমার জানা নাই। ৭ মার্চের ভাষণ মুক্তিযোদ্ধাসহ সব বাঙালির জন্য অনুপ্রেরণার । বজ্র কণ্ঠের এ বক্তৃতা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রতিনিয়ত বাজানো হত। যেটা থেকে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা অনুপ্রেরণা পেতেন।

এই ভাষণ পৃথিবীতে সর্বাধিক বাজানো ভাষণ, এ ভাষণ যতবার বাজানো হয়েছে পৃথিবীর কোনো ভাষণ, যতই শ্রেষ্ঠ ভাষণ থাক কোনো ভাষণ এতবার বাজানো হয়নি। এটা কতদিন বাজানো হয়েছে, কত ঘণ্টা বাজানো হয়েছে, কত মিনিটি বাজানো হয়েছে কেউ হিসেব করে বলতে পারবে না- কারণ এটা এত বেশি বার বাজানো হয়েছে। এবং কত মানুষ শুনেছে। আজ স্বাধীনতার ৫০ বছর পার হয়ে গেছে। এ ভাষণেরও ৫০ বছর চলছে। ৫০ বছরে প্রতি ৭ মার্চ এ ভাষণ বাজানো হয়েছে, জাতির পিতার জন্মদিনে বাজানো হয়েছে, ২৬ মার্চ বাজানো হয়েছে, ১৬ ডিসেম্বর বাজানো হয়েছে, আওয়ামী লীগ সহ সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনে এটা বার বার বাজানো হয়েছে।

পাকহানাদার বাহিনীর অপছন্দের কারণে এই ভাষণ ৭৫ এর পর নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। একের পর এক মিলিটারি ডিকটেটর যারা এসেছিল তারা সবাই এই ভাষনকে নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিলো। নিষিদ্ধ থাকলেও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা পিছিয়ে থাকেনি। সারা বাংলাদেশে হাটে, মাঠে-ঘাটে। এ ভাষণ বাজাতে থাকে। ভাষণ বাজাতে গিয়ে আওয়ামী লীগের বহু নেতা-কর্মী নিগৃহিত হয়েছেন এমনকি জীবন দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের ক্ষুদ্রতম কর্মী হিসাবে আজ তাদেরকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি।

যারা এক সময় এ ভাষণ নিষিদ্ধ করেছিল তারা ধীরে ধীরে আস্তাকুড়ে যাচ্ছে, তারা আস্তাকুড়েই চলে যাবে, আর নিঃশেষ হয়ে যাবে। বেঁচে থাকবে তারাই।  যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ ও দেশের মানুষকে  ভালোবাসবে ।

লেখকঃসদস্য, কৃষি ও সমবায় উপ-কমিটি ,বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।